- অনুবাদ
- অভিধান
- আইন আদালত
- জোক্স
- আত্মজীবনী
- শিশুতোষ গ্রন্থ
- আবৃত্তি
- ইতিহাস ও সংস্কৃতি
- উপন্যাস
- জাতকের গল্প
- কবিতা
- কম্পিউটার
- কাব্যনাট্য
- চিকিৎসা
- চিত্রকলা
- ছোটগল্প
- জীবনী
- জীববিজ্ঞান/ভূগোল
- দর্শন
- দিনপঞ্জি
- ধর্ম
- রাষ্ট্রবিজ্ঞান
- নাটক
- নারীবিষয়ক
- পরিসংখ্যান
- পাখি
- প্রবন্ধ
- ফোকলোর
- বিজ্ঞান
- বিবিধ
- বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী
- ভাষা ও ব্যাকরণ
- ভ্রমণ
- মনোবিজ্ঞান
- মুক্তিযুদ্ধ
- রচনাসমগ্র
- রম্য
- রান্না
- রূপচর্চা
- লোকসাহিত্য
- শিল্পকলা
- স্মৃতিকথা
- সংকলন
- ভৌতিক উপন্যাস
- সংগীত/স্বরলিপি
- গবেষণা
- গল্প

জন সাইটটি দেখেছেন
তাঁর সঙ্গে সুন্দরবনে
হুমায়ূন আহমেদ ঘুরতে ভালোবাসতেন। একাকী না বেড়িয়ে তাঁর পছন্দ ছিল দল বেঁধে বন্ধুবান্ধব নিয়ে হইচই করে বেড়ানোয়। ২০০৯ সালে তেমনই এক সফরে গিয়েছিলেন সুন্দরবনে। হুমায়ূন আহমেদ নেই, কিন্তু তাঁর স্মৃতি এখনো অমলিন। সফরসঙ্গী ও ঘনিষ্ঠ এক সহচরের স্মৃতিচারণা
মাত্র ১০ দিন আগে আমাদের পঞ্চপর্যটকসহ একদলের সঙ্গে সুন্দরবন ঘুরে এসেও আরেকবার পাঁচ দিনের জন্য সুন্দরবনের জাহাজে উঠতে হলো। তার কারণ, অন্যপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলামের কঠিন আবদার। এই আবদারের মধ্যে একটি বাক্য ছিল এমন, ‘লেখক হুমায়ূন আহমেদের আদেশ—তাঁর প্রিয় যে মানুষগুলোকে নিয়ে তিনি সুন্দরবন দেখতে চান, তার মধ্যে তুমি আছো এবং তোমাকে যেতেই হবে।’
২০০৯ সালের ১১ জানুয়ারি। সদরঘাট থেকে ঢাকা ইমপেরিয়াল কলেজের তেতলা জাহাজটি ছাড়তে ছাড়তে প্রায় সন্ধ্যা। এই কলেজটি এর আগেও ১২ বছর ধরেই তাদের ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের নিয়ে এমন আয়োজন করে এসেছে। প্রতিবছরই ছাত্রছাত্রী-অভিভাবকসহ সুন্দরবন বেড়াতে যায়।
এবারের আয়োজনও যথেষ্ট নিখুঁত। জাহাজের ডেকেই গরু-ছাগল বাঁধা, ডিপ ফ্রিজ-ভর্তি মাছ-তরকারি। কোনো কিছুরই কমতি নেই কোথাও। শ তিনেক ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকেরা ঠাঁই নিয়েছেন নিচে ও দোতলায়। হুমায়ূন আহমেদের বন্ধু এবং কলেজের প্রিন্সিপাল ও তাঁর পরিবারের জন্য বরাদ্দ তেতলার কেবিনগুলো। হুমায়ূন আহমেদের বন্ধুতালিকায় আছেন তাঁর কলেজজীবনের বন্ধু স্থপতি করিম, লেখক রশীদ হায়দার, প্রকৌশলী সেহেরী, আছে মাসুদ আকন্দ এবং অন্যপ্রকাশের মাজহারুল ইসলাম। বেশির ভাগ অতিথিই এসেছেন পরিবারসমেত, তিনজন মাত্র সিঙ্গেল। রশীদ হায়দার, আমি আর মাসুদ আখন্দ। সিঙ্গেলরা সিঙ্গেল বেডের কেবিনে, ডাবলরা ডাবল কেবিনে। আর হুমায়ূন আহমেদ তিন বছরের শিশু নিষাদকে নিয়ে আমার পাশের কেবিনে।
নদীর বুকে শীতের সকালটা দেখার জন্য ঘুম ভাঙতেই কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে দেখি হুমায়ূন আহমেদ একা একা সামনের করিডরে পায়চারি করছেন। তাঁর অতি পরিচিত ভঙ্গি, পেছনে দুই হাত চেপে ধরে একবার সামনে যাচ্ছেন আবার ফিরে আসছেন। আমাকে একপলক দেখেই ‘গুডমর্নিং’ বলে আবার হাঁটতে শুরু করলেন। আমি রেলিং হেলান দিয়ে দাঁড়াই। তিনি আরেকটা চক্কর শেষ করে এসে দাঁড়ান। বলি, ‘স্যার, আপনি কি সব সময় এমন হাঁটেন, এটা কি মর্নিং ওয়াক?’
স্যার বলেন, ‘প্রায়ই হাঁটি। বাসায়ও হাঁটি এ রকম। এই হাঁটার সময় লেখা জমাই মনে মনে। শোনো, তখন নুহাশ অনেক ছোট। একদিন আমাকে বলে, “আমি কখনো লেখক হব না।” আমি বললাম, কেন? ও বলল, লেখকদের ঘরের মধ্যে অনেক হাঁটাহাঁটি করতে হয়। আমি হাঁটাহাঁটি করতে পারব না।’ এটুকু বলে একটা মুচকি হাসি দিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলেন।
সকালটা বেশ ফুরে ফুরে। শীতের সকাল। মিষ্টি রোদের কিছুটা এসে পড়েছে জাহাজের ডেকে, কিছুটা আটকে আছে ছাদের ছাউনিতে। প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে ডেকে এসে ছায়ায় বসে আছেন সবাই। স্যার হঠাৎ বললেন, ‘আমি ভুল করে কোনো রিডিং মেটেরিয়াল নিয়ে এলাম না, তুমি কিছু এনেছ?’
বললাম, ‘না স্যার। আমার সঙ্গে একটা বইয়ের ফাইনাল প্রুফ ছাড়া কিছু নেই।’
স্যারকে কে একজন যেন একটা ইংরেজি বই এনে দিল। সস্তা কোনো পেপারব্যাক সংস্করণ। সেটাই নিবিষ্ট মনে পড়তে শুরু করলেন। পৃষ্ঠাদুয়েক পড়ে বই ফেরত দিয়ে দিলেন। ‘নাহ-কনসেনট্রেট করতে পারছি না।’ পরক্ষণেই যোগ করেন, ‘এমন কখনো হয় না, আমি বেড়াতে গেলে সব সময় কিছু বই আমার সঙ্গে থাকে। এবার কী ভুলটাই না করলাম।’
পাশে বসেছিলেন রশীদ হায়দার। গল্প শুরু হয়ে গেল। রশীদ হায়দার স্যারের বন্ধুতালিকার অতিথি হয়ে আসেননি। তিনি আয়োজক কলেজের প্রিন্সিপাল মাহফুজুল হকের আমন্ত্রণে এসেছেন। তিনি প্রিন্সিপালের আপন খালাতো ভাই। তবে সফরে হুমায়ূন আহমেদ যাচ্ছেন শুনেই মূলত এই নৌবিহারে তিনি বিশেষ আগ্রহ নিয়ে যোগ দিয়েছেন।
হুমায়ূন আহমেদই একসময় রশীদ হায়দারের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের সূত্রপাতের ঘটনা বললেন।
একসময় রশীদ হায়দার বাংলা একাডেমীর উপপরিচালক ছিলেন, উত্তরাধিকার নামক বাংলা একাডেমীর সাহিত্যপত্র সম্পাদনা করতেন। একদিন হুমায়ূন আহমেদ একটা গল্প নিয়ে গেছেন উত্তরাধিকার-এর জন্য।
গল্পটা হাতে নিয়ে না পড়েই তিনি ছাপার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। হুমায়ূন আহমেদ জানতেন যে উত্তরাধিকার-এ শুধু ‘ভারী ভারী লেখা ছাপা হয়। সেখানে তাঁর লেখা ছাপা হবে কি না, এ নিয়ে সংশয় ছিল।
রশীদ হায়দার বলেন, ‘তখন হুমায়ূন স্বনামেই বিখ্যাত। তাঁর নাম ছড়িয়ে গেছে সব জায়গায়। সুতরাং তাঁর লেখা ভালো হলো কি মন্দ হলো, এটা সে বুঝবে আর তার পাঠক বুঝবে। লেখা খারাপ হলে পাঠক বাংলা একাডেমীকে গালি দেবে না, হুমায়ূনকে দেবে। সুতরাং আমি ঝুঁকি নেব কেন? আমি গল্পটি ছেপেছি।’
রশীদ হায়দার এই যাত্রায় সঙ্গী হওয়ায় সবচেয়ে বেশি লাভ হলো আমার। তিনি আড্ডার এক পর্যায়ে আমার সক্রেটিসের বাড়ি বইটির প্রুফ কপি, আমার হাত থেকে টেনে নিয়ে পড়তে শুরু করে দিলেন এবং নিজেই উদ্যোগী হয়েই ভুল বানানগুলো সংশোধন করে দিতে শুরু করলেন। এর ফল দাঁড়াল আমি একেবারে কর্মহীন হয়ে পড়লাম। অগত্যা আমি আমার ক্যামেরাযুগল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। মাজহারুল ইসলামের ছেলে অমিয়কে বানালাম আমার প্রেজেন্টার। তাকে মাইক্রোফোন ধরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘তুমি যা ইচ্ছা করো, আমি রেকর্ড করি।’ সে প্রথমেই সোজা গিয়ে হাজির হলো হুমায়ূন আহমেদের কাছে।
অমিয়: আচ্ছা, এ মুহূর্তে আপনার কেমন লাগছে?
হুমায়ূন: খুব ভালো লাগছে।
অমিয়: আপনি জানেন, আমরা যে সুন্দরবন যাচ্ছি, সেখানে অনেক কুমির আছে?
হুমায়ূন: কুমির থাকবে পানিতে, আমরা থাকব জাহাজে, আমাদের চিন্তা নেই।
অমিয়: আচ্ছা, যদি কুমিরের বাচ্চা পাওয়া যায়, আপনি কী করবেন?
হুমায়ূন: বাচ্চা পেলে বাসায় নিয়ে আসব। কচ্ছপের বাচ্চা আছে বাসায়। কুমিরের বাচ্চা আর কচ্ছপের বাচ্চা গল্প করে সময় কাটাতে পারবে।
বিকেলে বিশাল মাদুর পাতা হলো জাহাজের ছাদে। দূরে দিগন্ত রেখায় বাংলাদেশের এক চিলতে জনপদের সামান্য চিহ্ন, আরেক দিকে শুধুই হা হা জল, অর্থাৎ সমুদ্র। জাহাজের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কতগুলো গাংচিল উড়ে উড়ে আসছে আমাদের জাহাজের সঙ্গে। যেন পথ দেখাচ্ছে।
হুমায়ূন আহমেদ তাঁর নাইকন এন-নাইনটি ক্যামেরাটা নিয়ে সেই পাখিগুলোর ছবি তোলার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। ক্যামেরা ধরার ধরন দেখেই বুঝলাম, তিনি ছবি তোলায় তত ঝানু নন।
সূর্য ডুবে যাওয়ার পর জানুয়ারির কনকনে ঠান্ডা হাওয়ায় জাহাজের ছাদে বেশিক্ষণ টেকা গেল না। বাধ্য হয়ে নিচে নেমে এসে চাদর দিয়ে জাহাজের বাতাস আসার খোলা হ্যাঁচগুলো আটকে রাতের আড্ডায় বসে গেলাম আমরা। হুমায়ূন আহমেদের বারবার অনুরোধে শাওন গান ধরেন। এবং প্রতিবারই শাওন গান শুরুর আগে হুমায়ূন আহমেদ তাঁর স্বরচিত গানের শানে নজুল শোনান। বেশির ভাগ গানই শাওন ও তাঁর বিবাহপূর্ব সম্পর্কের বিভিন্ন ঘটনাপর্যায়ে লেখা। তবে নিজের লেখা গান ছাড়াও রবীন্দ্রনাথের পূজাপর্বের কিছু গানও শাওনের গলায় মাধুরী ছড়াল। আমরা মুগ্ধ শ্রোতার মতো বসে বসে মাঝ রাত অবধি গান শুনলাম।
তিন দিনের মাথায় আমরা সুন্দরবনে পৌঁছে গেলাম। ‘হিরণ পয়েন্ট’ নামক একটা জায়গায় আমাদের জাহাজটা সমুদ্রেই নোঙর করল। ওখান থেকে সুন্দরবনের ভেতর ঢোকার জন্য দুটো ছোট ট্রলারে চেপে বসলাম। ট্রলার দুটোর ছাদ নেই, আসলে খোলা বড় ইঞ্জিন নৌকা ওদুটো। নৌকা আমাদের নিয়ে ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে সুন্দরবনের ছোট ছোট খালের ভেতর। আমরা নৌকায় বসে থেকেই হরিণ দেখার চেষ্টা করি। ট্রলারের মাঝি আমাদের আগ্রহ নিয়ে জানায়, এখানে সে দুইবার বাঘকে খাল পাড়ি দিতে দেখেছে। মাঝির এই তথ্যে আমাদের মধ্যে আগ্রহের পরিবর্তে বরং ভীতির সঞ্চার হলো। আপাতত কারোরই বাঘ দেখার ইচ্ছা নাই। যদিও বন্দুক হাতে আমাদের সঙ্গে কোস্টগার্ড আছে।
আমাদের দুই ধারে নানা রকম কেওড়াগাছ, স্বচ্ছ নীল জল। কিন্তু স্যারকে খুব মুগ্ধ হতে দেখলাম না। সুন্দরবন সম্পর্কে তাঁর মনের মধ্যে যে ধারণা ছিল, তিনি প্রকৃত সুন্দরবন দেখে মনে হলো কিঞ্চিৎ হতাশ। শুধু মাঝিকে ডেকে কখনোবা কোন গাছটির কী নাম জানতে চাইলেন মাত্র। নৌকার মধ্যে যতক্ষণ বসে ছিলেন, প্রায় সারাক্ষণই শিশুপুত্র নিষাদের হাত ধরে ছিলেন।
একসময় একটা খালের মুখে এসে আমাদের নৌকা থামে। এখানে একটা মাচা বাঁধা। মাচা দিয়ে অনেক দূর হেঁটে চলার পথ। এ পথটি মাটি থেকে ফুট চার-পাঁচেক ওপরে, অনেকটা তক্তা দিয়ে গাঁওগেরামে যেমন ব্রিজ বানানো হয়, সে রকম। এই পথ দিয়ে অনেকটুকু হেঁটে সুন্দরবনের ভেতরে যাওয়া যায়। আমরা প্রায় ১০০ মিটারের মতো পথ পেরিয়ে বনের খানিকটা ভেতরে ঢুকি। এমন সময় আমাদের গাইড হঠাৎ করে চিৎকার করে ওঠে। থামুন সবাই, আর যাবেন না।
সবাই দাঁড়িয়ে যান। গাইড বলে, ‘বাঘের ঘ্রাণ পাচ্ছি, সামনেই বাঘ আছে।’
শোনামাত্র দ্রুত ইউটার্ন। প্রায় পড়িমরি করে নৌকায় ফিরে এলাম সবাই। হুমায়ূন আহমেদ ফিসফিস করে বলেন, ‘এটা ওই ব্যাটার চালাকি। সে কোনো রিস্কের মধ্যে যেতে চায় না বলেই বাঘের ভয় দেখিয়ে সবাইকে নিয়ে ফেরত যাচ্ছে।’
তৃতীয় রাতে হঠাৎ বাইরে থেকে, অন্ধকারে আমার নাম ধরে স্যার ডাক দিলেন: ‘এই শাকুর, তাড়াতাড়ি তোমার ক্যামেরা নিয়ে আসো। দেখো ওটা কী?’
আমি এসে দেখি শীতের ঠান্ডা হাওয়ার মধ্যে ডেকের ওপর ভারী একটা জ্যাকেট পরে স্যার একা বসে আছেন, সিগারেট খাচ্ছেন।
আমি কাছে যেতেই বলেন, ‘দেখো, ওটা দেখো। ছবি তুলতে পারবা?’
যে দৃশ্য দেখলাম, আমার কাছে অভূতপূর্ব। সূর্য ওঠা, সূর্য অস্ত যাওয়া, দুটোই আমি বহুবার বহুভাবে দেখেছি। এবং তার কিছু ছবি আমি বিভিন্ন সময় ফ্রেমবন্দী করারও চেষ্টা করেছি। তবে সূর্যাস্তের ছবি তুলে আমি কখনোই আনন্দ পাই না। এ দৃশ্যটা এমনিতেই এত সুন্দর যে, ক্যামেরার ফ্রেমে ছোট করে এনে তাকে কোনো ব্যঞ্জনাই দেওয়া যায় না। সুন্দরী মেয়েদের ছবি তুলে যেমন তাদের তুষ্ট করা যায় না, আমারও মনে হয়েছে প্রকৃতির সুন্দর ছবিও কখনো প্রকৃতির চেয়ে সুন্দর হয় না। আমি এ জন্য সূর্যাস্তের ছবি তুলতে আগ্রহ পাই না। কিন্তু এটা সূর্যাস্ত নয়, চন্দ্র উদয়ের ছবি! রুপালি থালার মতো গোল একটা চাঁদ দূরের বঙ্গোপসাগরের জলের তলা থেকে যেন ধীরে ধীরে ওপরে উঠে আসছে, সমুদ্রের পানিতে তার অপরূপ একটা প্রতিবিম্ব। সমুদ্রের ছোট ছোট ঢেউয়ে পানির সেই প্রতিবিম্বে তিরতিরে কাঁপন। আর সঙ্গে জোছনা, সে এক বিস্ময়কর রূপ।
আমি নানাভাবে এই মুহূর্তটি ফ্রেমবন্দী করার চেষ্টা করি। ছবি তোলা শেষে ছবিগুলো ল্যাপটপে নিয়ে তাকে দেখাই। দুজনেই বুঝি চোখ আর ক্যামেরার লেন্সের দেখার মধ্যে তফাৎ অনেক। তার পরও ওখান থেকে একটা ছবি পছন্দ হয় হুমায়ূন আহমেদের। বলেন, ‘এ ছবিটি ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট প্রিন্ট করে আমাকে দিয়ো। নুহাশপল্লীর ঘরে টাঙিয়ে রাখব।’
গল্প-কথায় চাঁদ আরও ওপরে উঠে যায়। খানিক আগে সাগরের জলে ভেসে ওঠা সেই অপরূপ প্রতিবিম্বও হারিয়ে যায় জলের গা থেকে। তার পরও শীতের ওই হিম ঝরানো ঠান্ডায় আমরা চুপচাপ বসে থাকি। কোনো কথা হয় না। শুধু ভাবি চাঁদ, জোছনা নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ তো কম লেখেননি!
সুন্দরবন ভ্রমণের শেষ দিনে আমাদের জাহাজ দাঁড়িয়ে থাকে দুবলারচর থেকে প্রায় সিকি কিলোমিটার দূরে, সাগরে।
বিকেলের সূর্য ডোবার আয়োজন চলছে। একটা ছোট নৌকা করে দুবলারচরে এসে নামি আমরা।
মাঝখানে এক জায়গায় স্তূপাকারে জড়ো করে রাখা চেলাকাঠ। অর্থাৎ ক্যাম্পফায়ারে অংশ নিতে যাচ্ছি। আগেই ওখানে চেলাকাঠ ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে কলেজের ছাত্র-শিক্ষক-অতিথি আর দুবলারচরের জেলেরা। মাজহারের হাতে হ্যান্ডমাইক। রানিং কমেন্ট্রি দিচ্ছেন এই আয়োজনের। শাওন আর হুমায়ূন আহমেদ প্রথমে একটা লাঠিতে আগুন ধরালেন। তারপর চেলাকাঠে আগুন দিতেই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল পুরো স্তূপটায়। আর ক্যাম্পফায়ারের এই ক্ষণটাকে আরেকটু ফিল্মিক করার জন্য ব্যাকগ্রাউন্ডে শুরু হলো গান, ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’। মাইক হাতে নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বললেন, ‘আই অ্যাম ভেরি সারপ্রাইজড... আজকের এই অনুষ্ঠানটি যে এত সুন্দরভাবে শুরু হবে আমি চিন্তাও করিনি...শীতের এই সন্ধ্যা বেলায় একটু দূরে সমুদ্র, ধু ধু বালুকাবেলায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি...অসম্ভব সুন্দর একটি পরিবেশ...এই সন্ধ্যাটি মনে হচ্ছে শুধু আমাদের জন্য...’।
হুমায়ূন আহমেদকে যেন কথায় পেয়ে বসেছিল সেদিন সন্ধ্যায়। তিনি একপর্যায়ে একে একে তাঁর সঙ্গে আসা বন্ধুদের ডেকে এনে পরিচয় করিয়ে দিলেন সবার সঙ্গে।
বেশি রাত অবধি এখানে থাকার সুযোগ নেই, সুবিধাও নেই। কেরোসিনের কুপি নিয়ে শুঁটকিজীবী জেলেরা যে যার ঘরে বসে আছে। আমরাও ফিরে চলি। জাহাজে এসে শুনি হিসাবে একটা ছেলে কম এসেছে। এ নিয়ে খোঁজ খোঁজ রব পড়ে গেল। মাইকেও বারবার তার নাম বলে ঘোষণা দেওয়া হলো।
এদিকে আগেই কলেজের একটা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার ব্যাপারটি নির্দিষ্ট ছিল, মায় অনুষ্ঠান শেষে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে রাতের খাবার।
পুরস্কার অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে মাইক হাতে নিলেন হুমায়ূন আহমেদ। তিনি বললেন, ‘আমি জাহাজে এসে যখনই শুনলাম যে একটা ছেলেকে পাওয়া যাচ্ছে না, আমি শিহরণ বোধ করছিলাম। দেখি না কী হয়! ছেলেটাকে যদি পাওয়া না যায়, সে ক্ষেত্রে কী কী ঘটনা ঘটতে পারে আমি এঁকে এঁকে সাজাচ্ছিলাম মনে মনে। আবার ছেলেটা কী কী কারণে মিসিং হতে পারে, সেগুলোও সাজালাম। আমার ধ্যান ভেঙে গেল যখন শুনলাম, ছেলেটিকে পাওয়া গেছে। তাকে খুঁজে পেতে আরেকটু দেরি হলে আমার আনন্দ আরেকটু বেড়ে যেত। মানুষের যে কোনো সংকটকালীন মুহূর্ত উপভোগ করার মধ্যেও এক ধরনের আনন্দ উপভোগ করা যায়। আমি এ বিষয়টি বেশ উপভোগ করি।
‘ছাত্র হারানোর পর সে যখন ফিরে এল তখন তার বন্ধুদের চোখে-মুখে এক ধরনের মুগ্ধতা ফুটে উঠবে। এ মুগ্ধতা একজন লেখককে মুগ্ধ করবেই।’
শেষ অনুষ্ঠান আকাশে ফানুস ওড়ানো। ফানুস ওড়ানোর কাজটিও হুমায়ূন আহমেদকে দিয়েই শুরু হবে এবং এক এক করে তিনটি ফানুস ওড়ানো হবে। সব শেষ ফানুসটি ওড়ানোর মধ্য দিয়েই সমাপ্তি হবে সুন্দরবন বিহারের।
হুমায়ূন আহমেদ গভীর মনোযোগ দিয়ে একটা ফানুসে অগ্নিসংযোগ করলেন। চোখের সামনে আগুনের গোলার মতো ফানুসটা ফুলে উঠে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠে যেতে শুরু করল
আমি পাশ থেকে অস্ফুট গলায় বললাম, ‘এর নামই তাহলে ফানুস, স্যার?’
হুমায়ূন আহমেদ এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আমার মুখের দিকে তাকান। একটু পরে বলেন, ‘কেন, আগে দেখোনি কখনো?’
বললাম, ‘না, স্যার। একবার এক কবিতায় পড়েছিলাম: ১০০ ফানুস ওড়ানোর আজন্ম সলজ্জ সাধ ছিল সেই তরুণের। তখনই ফানুস শব্দটা আমার মাথায় আসে, আমারও জানতে ইচ্ছে হয়, ১০০ ফানুস ওড়ালে কী হবে?’
আমাকে অবাক করে দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বলেন, ‘আমিও আজই প্রথম ফানুস দেখলাম।’